‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণা দিয়ে গত মাসের শুরুতে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর বড় অংকের শুল্ক ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে ৯০ দিনের জন্য বেশির ভাগ শুল্ক স্থগিত করলেও বাজারে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা কমেনি। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) চুক্তির সংখ্যা। ব্যবসা সম্প্রসারণের পথ থেকে পিছু হটছেন ব্যাংকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিইওরা। একই পরামর্শ দিচ্ছেন গ্রাহকদেরও। তারা বলছেন, পরিস্থিতি সুস্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই উত্তম।
ব্যবসায়িক চুক্তিবিষয়ক ডাটা পরিষেবা সংস্থা ডিলজিককে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, গত মাসে বিশ্বজুড়ে ঘোষিত এমঅ্যান্ডএ চুক্তি ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি তা কভিড-১৯ মহামারী ও ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় থেকেও কম।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এমঅ্যান্ডএ বাজার যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে গত মাসে ৫৫৫টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, যা ২০০৯ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন।
এ ধরনের চুক্তিতে যুক্ত থেকে ফি ও বোনাস পেয়ে থাকেন ব্যাংকাররা। তারা এখন গ্রাহকদের অপেক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ক্ষেত্রে আরো স্পষ্টতা এলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলছেন। মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ট্রাইস্ট সিকিউরিটিজের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লরেঞ্জো পাওলেটি বলেন, ‘গ্রাহককে অপেক্ষা করতে বলছি। সিইও ও সিএফওরা এখনো বুঝে উঠতে পারেননি যে শুল্কনীতি কীভাবে তাদের প্রভাবিত করবে। তাই নগদ অর্থ হাতে রেখে এখন অপেক্ষা করা ভালো হবে।’
ব্যাংকাররা আশা করেছিলেন, ব্যবসাবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের অধীনে এমঅ্যান্ডএ খাতে দুর্দান্ত সময় পার করবে চলতি বছর। কিন্তু তার শুল্কনীতি ঘোষণার পর বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বাজারে, তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক চুক্তি কমতে থাকে। গত মাসে সারা বিশ্বে স্বাক্ষরিত চুক্তির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৩০, যা ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন এবং মাসিক গড়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম।
অবশ্য এমঅ্যান্ডএ খাতে বছরের শুরুটা ছিল বেশ নিষ্প্রভ। এ সময় খুব কম চুক্তি হয়েছিল। এমন অবস্থার মধ্যে কিছু বড় চুক্তি সামগ্রিক ধীরগতি কিছুটা সামাল দিতে সাহায্য করেছে। তেমন একটি চুক্তি হয়েছে এপ্রিলে। এ সময় গ্লোবাল পেমেন্টস নামের একটি কোম্পানি ২ হাজার ৪২৫ কোটি ডলারে প্রতিদ্বন্দ্বী কার্ড প্রসেসিং ও অ্যাকাউন্ট সার্ভিস ফার্ম ওয়ার্ল্ডপে অধিগ্রহণ করে।
চুক্তিটি বড় অংকের হলেও ডিলজিকের তথ্যানুসারে বাজার প্রত্যাশা অনুসারে যথেষ্ট ছিল না। এপ্রিলে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমের মূল্য কমে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা মার্চের তুলনায় ৫৪ শতাংশ এবং গত ২০ বছরের মাসিক গড়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কম।
বিশ্বের বড় চার অ্যাকাউন্টিং ফার্মের একটি কেপিএমজি। সংস্থার গ্লোবাল ডিল অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টিন পাথিয়ার জানান, তারা এমঅ্যান্ডএ খাতে শুল্কনীতির প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষক লিসা শালেট জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে এপ্রিলে বাজারে রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায় অস্থিরতা।
নির্বাচনী প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, অভিধানে তার সবচেয়ে প্রিয় শব্দ ‘শুল্ক’। হোয়াইট হাউজে প্রবেশের আগেই বারবার এ বিষয়ে মন্তব্য করেন তিনি। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের। শুরুতেই চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক আরোপ করেন, যার মধ্যে কিছু শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। এরপর ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রথম সব মার্কিন আমদানির ওপর অন্তত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং পরে ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেন। তবে ইউরোপ থেকে জাপান পর্যন্ত অনেক প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের জন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ সর্বজনীন হারের তুলনায় অনেক ˆবশি। শুধু চীনের ক্ষেত্রেই শুল্ক বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এ সময় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের হুমকি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফেডের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিষয়টি বাজারে রাতারাতি উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
সামগ্রিক পতনের মাঝে গত মাসে এমঅ্যান্ডএর চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি খাত ছিল বেশ উজ্জ্বল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ খাতে ব্যবসায়িক মূল্য অ্যালগরিদম ও সফটওয়্যারের মতো মেধাস্বত্বের ওপর নির্ভর করে। এগুলো বস্তুগত পণ্যের মতো শুল্কের আওতায় না থাকার সুবিধা নিয়েছে কিছু কোম্পানি। পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলারের চুক্তির মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রযুক্তি খাতের দখলে। আর বৈশ্বিক চুক্তিমূল্যের প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে শীর্ষ এ অর্থনীতি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পর শুল্কনীতিজনিত অনিশ্চয়তা সব খাতের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণকে সমানভাবে প্রভাবিত করছে না বলে মনে করছেন বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির এমঅ্যান্ডএ বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান কেভিন কক্স। তিনি বলেন, ‘টেলিকম, মিডিয়া, সেবা, তেল-গ্যাস ও অন্যান্য পরিষেবা খাত তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু শুল্কের কারণে শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তির কিছু অংশে ব্যবসায়িক মডেলে বড় পরিবর্তন আসছে।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে উপকরণ আমদানি করে অথবা পণ্য রফতানি করে এমন যেকোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর শুল্কের প্রভাব পড়বে।’
ব্যবসার মডেল ও প্রত্যাশিত রিটার্নের অতিরিক্ত ঝুঁকি ভালোভাবে বোঝার জন্য গ্রাহকদের সময় নিতে বলছেন কেভিন কক্স। গত ২২ এপ্রিল টমা ব্রাভোর কাছে ১ হাজার ৬০ কোটি ডলারে বোয়িংয়ের ফ্লাইট সফটওয়্যার সাবসিডিয়ারি জেপ্পেসেন বিক্রির পরামর্শ দিয়েছিল কক্সের টিম। একে তারা প্রযুক্তিভিত্তিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সামগ্রিকভাবে কেভিন কক্সের মূল্যায়ন হলো বাজার অস্থিরতা ব্যবসায়িক লেনদেনকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে দুটি পথ থাকে। অতিরিক্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন করে ক্রেতাদের খরচ করতে হবে অথবা পরিস্থিতির গতিপথ সুস্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাদের পিছু হটতে হবে।